কায়রোর পথে এক অনিশ্চিত সফরের দিনলিপি- ১

বিমান থেকে নেমে সরাসরি ইমিগ্রেশন রুমের দিকে অগ্রসর হলাম। কত ভয়, কত চিন্তা! কী না কী হয়! নাকি রিয়াদ ফিরে যেতে হয়! আগত যাত্রীদের সাথেই দাঁড়িয়ে গেলাম ভিসা-অন-এরাইভাল সংগ্রহ করার জন্য। আমার সামনে যারা ছিলেন, তাদের অধিকাংশই ইংরেজ মনে হলো। খুচরা ডলার হাতে নিয়ে প্রস্তুত। কিছুক্ষণ পরই আমার সিরিয়াল এলে দায়িত্বরত ভদ্রলোক চাওয়ার আগেই ডলারগুলো বাড়িয়ে দিলাম। তিনি খুব দ্রুত আমাকে একটি স্টিকার হাতে ধরিয়ে দিলেন। মিশরে যারা ভিসা-অন-এরাইভালে আসে, তাদের এভাবেই নির্ধারিত ডলার দিয়ে স্টিকার সংগ্রহ করতে হয়—বোধ করি। সফরের শুরু থেকে যে ভয় অন্তরকে ভারী করে রেখেছিল, তার কিছুটা হলেও সরে গেল। এগিয়ে গেলাম ইমিগ্রেশন অফিসারের দিকে। বসে আছেন এক ভদ্রমহিলা। তিনি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখে দ্রুত সিল দিয়ে পাসপোর্ট ফেরত দিলেন। মনের সকল ভয় মুহূর্তেই উবে গেল।

সেই দুয়েক দিন আগেও মিশর সফরের ব্যাপারে সিরিয়াসলি ভাবিনি। এক অপরাহ্নে আজারবাইজান দূতাবাস থেকে বের হয়েই মিশর সফরের চিন্তা মাথায় আসে। সাকানে ফিরেই মাত্র দুই দিন পরের টিকিট বুক দিয়ে দিয়েছিলাম এক অনিশ্চয়তা নিয়ে।
ইমিগ্রেশন হল থেকে বেরুতেই নজরে পড়ল মানুষ ও গাড়ির ভিড়। এ যেন বিমানবন্দর নয়—চট্টগ্রামের অলংকার বাসস্টেশন! পরে জানলাম, এটা কায়রোর পুরোনো স্টেশন। এখানে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল নাঈম। মিশর সফরের অল্প যা প্রস্তুতি, তার অনেকাংশই নাঈমের সাথে আলাপ করেই নেওয়া। নাঈম আমার অন্যতম প্রিয় উস্তাদ-পুত্র। তাড়াহুড়ো করে আসাতে কোথায় উঠব, তাও ঠিক করে আসতে পারিনি। তবে বিমানে ওঠার আগেই ঠিক হলো, আপাতত আজহারে পড়তে আসা কিছু বাংলাদেশি ছাত্রদের মেসে উঠব। বিমান বন্দর থেকে ট্যাক্সি ভাড়া করে সেদিকে রওয়ানা দিলাম। আজহার থেকে একটু দূরেই এই বাসা।
আমরা পৌঁছাতে রাত হয়ে গেল অনেক। বাসার সবাই ঘুম। এক রুমে একটি খালি সিটে আমার থাকার ব্যবস্থা হলো। অবশ্য পরের দিন দুই অগ্রজ আজহারি—শ্রদ্ধেয় শাহাদাত ও ইমরান ভাইদের বাসায় থাকার ব্যবস্থা হয়। বাকি যে ক’দিন মিশরে ছিলাম, তাদের বাসাতেই ছিলাম। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।
সকালে রুম থেকে বের হলাম। কুয়াশাচ্ছন্ন মিশর, নিরিবিলি জুমার দিন। রাস্তা পার হয়ে চা-নাশতার জন্য গেলাম। এরপর রুমে এসে অপেক্ষা করতে লাগলাম জুমার জন্য। সময় হলে মসজিদে গেলাম। মসজিদে বসাকালীন বারবার কলকাতার কথা মনে পড়ছিল। এক যুগ আগে এমন এক জুমা পড়েছিলাম কলকাতার কোনো গলির মসজিদে। দুনিয়ার গ্রাম, শহর ও অলিগলি বুঝি অভিন্ন।
স্মৃতির এলবাম


-২-
জুমার নামাজ শেষে খাওয়া-দাওয়া করলাম বাংলাদেশি ভাইদের সাথে। আজহারে পড়ার আশায় আসা একেকজনের কাহিনি একেক রকম। কেউ ভর্তি হতে পেরেছেন, কেউ অপেক্ষা করছেন। বাসার অধিকাংশই কওমি মাদরাসার ছাত্র বলে মনে হলো। এমনিতে বর্তমান শায়খুল আজহার আজহারে পড়ালেখার পথ সহজ করে দিয়েছেন, যা আমাদের সময় কল্পনাও করতে পারতাম না। আসলে আমরা যা দূরে থেকে অসম্ভব মনে করি, কাছে এলে তার অনেক কিছুই সম্ভব—বরং সহজ হয়ে যায়।
তাদের কাছে জানলাম, বছরের একটি নির্ধারিত সময়ে অ্যাডমিশন পরীক্ষা হয়। পাশ করলেই আজহারের দরজা তার জন্য খুলে যায়। সেজন্য অনেকে মাস তিনেক আগে এখানে এসে সেই পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন।
যাই হোক, ইমরান ভাইয়ের সাথে আলোচনা করে ঠিক হলো বিকেলেই তাদের বাসায় উঠব। মাগরিব পড়ে সেদিকেই রওয়ানা দিলাম। আব্দুস সামাদ আর আমি চড়ে বসলাম পুরোনো আমলের একটি পাবলিক বাসে। বাস চলছে আর পুরাতন মিশরের বিভিন্ন দৃশ্য উপভোগ করছি। অবশেষে নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছে ইমরান ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। কোথায় নেমেছিলাম মনে নেই, তবে আজহারের ছাত্রাবাসের এক কোণায় রাস্তার পাশে। দূরে অল্প আলো ছাড়া চারদিকে অন্ধকার। ইমরান ভাই এলে আব্দুস সামাদকে সকৃতজ্ঞ বিদায় জানালাম। আর আমরা ছাত্রাবাসের পার্শ্বপথ ধরে হাঁটা দিলাম বাসার উদ্দেশ্যে।
এই বাসা অনেক পুরোনো। ইমরান ভাই বলেছিলেন, তারা প্রথম মিশরে এসে উঠেছিলেন এই বাসায়। আজও তারা সেখানেই আছেন। সময় ২০+ বছর তো হবেই। সে যাক, এত বড় দেশের অজানা শহরে একটি নিরাপদ আশ্রয় হয়েছে দেখে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলাম।
ইমরান ভাই আমাদের অনেক বড়—বয়সে, সম্মানে; এমনকি তিনি আমাদের উস্তাদদের সমবয়সী বলেই মনে হলো। কিন্তু ব্যবহার খুবই অমায়িক। অনেক বছর আগে তার মাধ্যমে কিছু অনুবাদের কাজ করেছিলাম। তিনি রীতিমতো সময় দিয়ে আমার পুরো শিডিউল ঠিক করে দিলেন। তখনই অনুভব হলো, আমি মিশরে এসেছি, অল্প দিন পরেই চলে যেতে হবে নিজ গন্তব্যে। দুনিয়ার জীবনটাই তো এমনই- এখানে আমরা কিছু সময়ের মেহমান। সফরের সময় হলে সব মায়া ত্যাগ করে চলে যেতে হবে একদিন। এভাবেই শেষ করলাম দুই রাত এক দিন।
এই পুরো সময়ের মধ্যে তেমন গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়নি। তবে বিমানে থাকা সেই আড়াই ঘণ্টা সময় ভালোই উপভোগ করেছি। সূরা ইউসুফের সাথে কেটেছে অধিকাংশ সময়। যদিও ঐ সময় মনে একটু ভয় কাজ করছিল, তারপরও চিন্তা করলাম—উপকারী কোনো কাজ করা যায় কিনা। কুরআনের সাথে সময় কাটানোর চেয়ে উত্তম কাজ আর কী হতে পারে!
সূরা ইউসুফ পড়তে গিয়ে দেখি।মোবাইলে কুরআন অ্যাপ নেই। মন খারাপ করে বসে আছি। কিছুক্ষণ পর খেয়াল করলাম, সামনের এক যাত্রী তিলাওয়াত করছেন। ইতস্তত বোধ না করেই তার কাছ থেকে অ্যাপটি নেওয়ার আবদার করলাম। বেশ কিছুক্ষণ পর সফল হলাম। শুরু করলাম আল্লাহর নবী ইউসুফের দেশে ভ্রমণের পূর্বেই “সূরা ইউসুফ”-এর আধ্যাত্মিক ভ্রমণ।
এইবারের ইউসুফ পাঠ কেবল পাঠ ছিল না, ছিল তাদাব্বুর—এক আধ্যাত্মিক সফর। উন্মোচিত হচ্ছিল প্রতি আয়াতের পরতে পরতে থাকা দ্যুতিময় পথ। আর দীর্ঘদিনের জটলা বাঁধা চিন্তার গ্রন্থিগুলো একের পর এক খুলছিল। সে কী প্রশান্তি! যতদূর মনে পড়ছে, পুরো সূরা শেষ করতে পারিনি সেদিন। এর আগেই পৌঁছে গেলাম কায়রোতে। রিয়াদ থেকে কায়রো—২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট। শেষ করতে না পারলেও একটি উপলব্ধি তাজা হলো—কুরআন থেকে উপকৃত হতে হলে পুরো মন-মগজ তাকে দিয়ে, তারপর বসতে হবে তাদাব্বুরে। তাহলেই পাওয়া সম্ভব হবে প্রশান্তি, সাকিনা, নূর ও হিদায়ত।
দয়াময় যেন কুরআন থেকে ভরপুর উপকৃত হওয়ার তাওফিক দান করেন।
সফরকাল ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
জুমাবার