সন্ধ্যাকালে কাতার প্রবেশ
।।১।।
মাগরিবের আগে কাতার বর্ডারে প্রবেশ করলাম। পুরো দিনের ক্লান্তি শেষে সূর্য তখন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছে। আরব সাগরের হিমেল বাতাসে সফরের ক্লান্তি উধাও হয়ে গেছে। আত্মিক প্রশান্তির অনন্য অনুভূতি মনোজগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই কয়েক মাস আগেই কুদসের ‘ মা হাউলে’ শুরু হওয়া ঘটনায় ভাঙ্গা হৃদয়ে একটু হলেও শান্তি অনুভূত হলো। দীর্ঘ ৮ ঘণ্টারও অধিক ড্রাইভ করে ৪ শতাধিক মাইল অতিক্রম করে আসতে যে পরিমাণ শারীরিকভাবে কষ্ট তার কথা বাদই দিলাম। দীর্ঘ এই যাত্রায় মাঝখানে নামাজ ও গাড়ীর আরামের জন্য মাত্র দুয়েক বার থেমেছিলাম। '২৪ এর শুরুতে এক ঠাণ্ডা সকালে বেরিয়ে পড়েছিলাম কাতারের পথে। অজানা ও দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া মোটেও সহজ ছিলো না। কিন্তু আল্লাহর তাওফিক জীবনে এত সুন্দর একটি অ্যাডভেঞ্চার উপহার দিলো। ফালিল্লাহিল হামদ।
পুরো পথজোড়ে আনন্দ বেদনার নতুন নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন হচ্ছিলো। আল্লাহর শুকরিয়া ও যিকির করতে করতে পথ চলছি আর চলছি। লক্ষ্য সালওয়া বর্ডার। রিয়াদ থেকে দাম্মামের মহাসড়কে এর কিছু দিন আগেও আসা হয়েছিলো। আমার একমাত্র সফরসঙ্গী ‘নিশান সানী’(গাড়ী) কে নিয়ে বাহরাইনের উদ্দেশে। কিন্তু বাহরাইনের দ্বারপ্রান্তে গিয়েও ভিসা জনিত সমস্যার কারণে ঢুকতে দেওয়া হয় নি। মনে আছে ঐ অভিমানে যে পথে গিয়েছি, ঐ পথেই ফিরে এসেছি রিয়াদে। দীর্ঘ ১৯ ঘণ্টা ড্রাইভ করেত হয়েছিলো সেদিন। এই অভিজ্ঞতার কথা অন্য সময় বলবো ইনশাআল্লাহ।
ইমিগ্রেশনের জন্য এগিয়ে চলছি। বিশাল এক মাঠে গাড়ী পার্ক করে একটি ছাউনির দিকে এগুতে লাগলাম। এক পাকিস্তানী ফ্যামিলি ছাড়া আর কোনো মানুষ দেখা যায়নি। মূলত ঐ ছাউনি বিশ্বকাপ উপলক্ষে অস্থায়ীভাবে করা হয়েছিল বলে মনে হলো। যা এখনো রয়ে গেছে।
দায়িত্বরত অফিসারদের কাছ থেকে জিজ্ঞেস করে নামাজের স্থানে গেলাম। মাগরিব আদায় করে ইমিগ্রেশনের জরুরী কাজ সারলাম। অফিসারদের সাথে কথার অভিজ্ঞতা ভালোই ছিলো।
কাতারের মাটিতে প্রবেশ করতেই এক মন মাতানো অনুভূতি মনোজগতে বিদ্যুতের মত ছড়িয়ে পড়লো। আমার গন্তব্য বর্ডার থেকে আরও ৪০-৫০ কিলোমিটার দূর। এক ঘণ্টা লাগবে। সমুদ্রের তীর ঘেঁষে যে রাস্তা দোহার দিকে চলে গেছে, সেটা ধরে আমি আস্তে আস্তে গন্তব্যের দিকে আগাচ্ছি। কত রকম চিন্তা মাথায় আসছে। কত অনুভূতি অন্তরে আলোড়ন সৃষ্টি করছে! কোথাকার এক বাংলাদেশী, বিদেশের মাটিতে নির্বিঘ্নে পথ চলছে। নিঃসন্দেহে এটা আল্লাহর অনেক বড় নেয়ামত!
।।২।।
মসজিদের সামনে পৌঁছতেই, রাশেদ ভাই নজরে পড়লো। তিনি ইশার সালাত শেষ করে মসজিদের বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। যেনবা আমার মত গুমনাম এক বান্দার শাহী স্বাগতমের জন্য তারা অপেক্ষ করছিলেন। এই সফরের শুরু-শেষ ছায়ার মত সঙ্গ দিয়েছেন রাশেদ ভাই। আল্লাহ Rashed Rahmaniকে উত্তম বিনিময় দান করুন।
আমি পৌঁছার আগেই রাশেদ ভাই আপ্যায়নের সকল ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। পৌঁছার পর পরই সরাসরি দস্তরখানে। সীমিত সাধ্যের মধ্যেও অসাধারণ আয়োজন করে রেখেছেন প্রিয় ভাই। আমি বেচারা পুরো দিনের ক্ষুধার্ত। তাই দেরি না করেই আহার শুরু করলাম।
।।৩।।
খাবার শেষে একটু বের হয়েছি। বাঙ্গালী হোটেলে আমরা শ্রদ্ধেয় বেলাল ভাইয়ের সাথে নাস্তা খেতে খেতে গল্প করছিলাম। বেলাল মাসরুর জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়ার মেধাবী ছাত্রদের অন্যতম। হঠাৎ তার কাছে জানতে পারি- কাতার সফরে আছেন শায়খ সালমান নদভী ও শায়খুনা সাজ্জাদ নোমানী। আমি নড়েচড়ে বসলাম। হযরতের ব্যাপারে জানতে চাইলাম। তেমন কোনো তথ্য না পেয়ে সরাসরি ভারতে শায়খের জামাতার সঙ্গে যোগাযোগ করি। সাধারণত উনার উত্তর দেরিতে আসে। ঐটা জেনেই যোগাযোগ করা। কিন্তু সেদিন খুব দ্রুত তাঁর পক্ষ থেকে সাড়া পেলাম। তিনি কাতারে বসবাসকারী এক মাওলানার নাম্বার দিয়ে যোগাযোগ করতে বললেন। কালক্ষেপণ না করেই ঐ মাওলানার সাথে যোগাযোগ করলাম। কিন্তু কোনো উত্তর নেই। অনেক বছরের একটি আশা পূরণ হওয়ার কাছাকাছি এসেও হবে না ভেবে মন ভারি। কিন্তু কাতার সফরের মত এত স্বপ্নের কাজ সহজে করার সুযোগের কথা চিন্তা করে মন সান্ত্বনা দিলাম। হযরতের সাক্ষাত পেলে নূরুন আলা নূর।
হযরতের সাথে সাক্ষাত ও কাতার সফরকে অর্থবহ করার পরিকল্পনার চিন্তায় যেন ঘুম আসছিলো না। এই সুযোগে ৩ দিনের সফরে কোথায় কোথায় যাওয়া যায়- তা নিয়ে আলাপ করছি রাশেদ ভাইয়ের সাথে। তিনি সাধ্য মত তথ্য দিয়ে সাহায্য করলেন। পরের দিন কী করবো, কী ঘটবে? সে স্বপ্ন নিয়েই ঘুমিয়ে পড়লাম নিজের মাতৃভূমি থেকে হাজার মাইল দূরে। নিজের ঠিকানা থেকে শত মাইল দূরে। কারো মেহমান হয়ে।
জীবন কত বৈচিত্র্যময়! এখন ঘরে, এখন সফরে। এভাবেই জীবনটা কেটে যায়। এসব কিছু বার্তা দিয়ে যায় আসলে আমরা এই দুনিয়ার ক্ষণিকের মুসাফির। মুসাফিরের মন যেভাবে সদা আপন ঠিকানার দিকে উন্মুখ হয়ে থাকে, আমাদেরও আসল ঠিকানার কথা সারাক্ষণ মনে রাখা উচিত। তাঁর জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত। আল্লাহ তাওফিক দিন।
রিয়াদ
০৬.০১.২০২৫
