কাতার সফরের অন্যতম অর্জনঃ শায়খ সাজ্জাদ নোমানীর স্মৃতিমধুর সাক্ষাৎ
।।১।।
১০ জানুয়ারি ২০২৪। বুধবারের সুন্দর একটি সকালে রওয়ানা দিয়েছিলাম প্রিয় শহর দোহার উদ্দেশে। চার দিনের এই সংক্ষিপ্ত সফরের প্রথম রাতটি কেটেছে দোহা শহর থেকে একটু দূরে । এই রাতের ঘুমটা ছিলো অপেক্ষার প্রহর গুনার মতো। অপেক্ষা ছিলো বেশ কিছু স্থান ভ্রমণ ও শায়খ সাজ্জাদ নোমানী হাফি. র সাক্ষাতের ।
১১ তারিখ ফজর আদায় করে রাশেদ ভাই কাছের একটা রেস্তোরায় নিয়ে গেলেন। হঠাৎ আমার মোবাইলে মেসেজ। "যদি শায়খের সাথে দেখা করতে চান সরাসরি এয়ারপোর্টে আসুন। আমরা বিমানবন্দরের পথে। হযরত আজকেই ফিরে যাচ্ছেন।" মাওলানা উসমানের ক্ষুদে বার্তাটি ঝিমানো শরীরে বিদ্যুতের সঞ্চার করলো। মাওলানা উসমান হযরতের আপ্যায়নের দায়িত্বে আছেন। বার্তা পেয়ে আমরা রওয়ানা দিলাম দোহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দিকে। আধা ঘণ্টার পথ। যাত্রাপথে নজর কাড়ছিলো দোহার সুরম্য দালান আর আকাশচুম্বী স্থাপনাগুলো। মহাসড়কগুলোর সাজসজ্জায় নতুনত্বের চাপ স্পষ্ট। বিশ্বাকাপের আয়োজক দেশ হিসেবে এ ধরণের আরও কত কাজ যে করতে হয়েছে! তার হিসেব আমার কাছে নেই।
।।২।।
আমাদের পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে হযরতের গাড়ীও পৌঁছল। আবেগগণ মন নিয়ে এগিয়ে গেলাম সালাম করতে। গাড়ীতে বসে আছেন শায়খ। পরিচয় দিলাম। মাথা নাড়িয়ে উত্তর সালামের দিলেন। ৮ বছর পর এই সাক্ষাত। এত দ্রুত চিনতে পেরেছেন বলে মনে হলো না। বিশেষ করে ভারত ও ভারতের বাইরে অসংখ্য মানুষ তার একটু খানি সাক্ষাত লাভের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে। সালাম করে একটু দূরে দাড়িয়ে অপলক দেখে আছি দ্যুতিময় চেহারা। মু'মিন বান্দার চেহারার নূর, পাথরমনকে স্পর্শ করে আল্লাহর হুকুমে। হযরত বিমানবন্দরের ভেতরে প্রবেশ করে একটি জায়গায় বসলেন। ভয়ে মুখ দিয়ে কিছুই বের হচ্ছিলো না আমার। সাহস করে এগিয়ে গেলাম। কথা বলা শুরু করলাম। বাংলাদেশের কথা বলতে হযরত বলে উঠলেন- অনেকেই বাংলাদেশে সফরের জন্য তোমাদের দেশ থেকে যোগাযোগ করে। কিন্তু কয়েকবার যোগাযোগ করে সবাই চুপ হয়ে পড়ে। বিষয়টি সামনে এগোয় না। জানি না কী সমস্যা।" আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে বাংলাদেশ সফরে হযরত পক্ষ থেকে কোনো বাধা নেই? তিনি বললেন- আমার এমেরিকার ভিসা রয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে তাগাদা আসে। শারীরিক অবস্থার কারণে কোথাও যেতে পারি না। কিন্তু বাংলাদেশে যাবার জন্য আমি সর্বদা প্রস্তুত।" এটা শুনে আনন্দিত হলাম। সৌভাগ্যবান মনে নিজেকে ও বাংলাদেশের মানুষকে। ভাবতে লাগলাম- কত মানুষদের দৃষ্টি রয়েছে এদেশের দিকে। এই দেশের মানুষের দিকে। যদি এদেশ জাতীয় সমস্যা সমাধান করে ইসলামের শক্তিকে ধারণ করে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লাভ করতো, এতদঞ্চলে আদর্শ রাষ্ট্র হতে পারতো!
হযরতের সুহবতে আছি- যেন কল্পনা মনে হচ্ছে। আসলে আল্লাহর তাদবীর (প্ল্যানিং) ও তাকদীর (ভাগ্য) বুঝা মুশকিল।
।।৩।।
সুযোগ পেয়েই হযরতকে আবদার করলাম, বাংলাদেশের তারুণ্যের উদ্দেশ্যে কিছু বলতে। সাধরে গ্রহণ করেছিলেন আমার সেই আবদার। হযরতের এই আচরণে এত বিস্মিত ও আত্মহারা হয়েছিলাম যে ঠিক মত মাইক্রোফোন সেটিং না করেই ভিডিও করতে মোবাইল দিয়ে দিলাম মাওলানা উসমানকে। আর হযরতকে নির্ধারিত প্রশ্ন না করেই মাইক্রোফোন দিয়ে দিয়েছিলাম। ফলে হযরত আমাদের আগের কথার উপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশ সফর নিয়ে ঐ ভিডিওতে কথা বলেছিলেন। যেখানে ফুটে উঠেছে মুসলিম বাংলার মাটি ও মানুষের প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসা। এদেশের তারুণ্য নিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষা। এবং সরাসরি এদেশে সফর করার এক দরদমাখা ইচ্ছা। এই কথাগুলো বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছা দরকার ছিলো। কিন্তু ভিডিওতে আওয়াজ অস্পষ্ট হওয়াতে আজ পর্যন্ত ঐ কথাগুলো পৌঁছাতে পারি নি। আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন। কিন্তু ঠিক করেছি মিনিট দুয়েকের ঐ ভিডিও প্রকাশ করা উচিত। আমি সাধ্যমতে হযরতের ঐ বার্তাটি স্পষ্ট করার চেষ্টা করবো। তা পারলে অন্তত অনুবাদ ও সাব-টাইটেল দিয়ে ভিডিও-বার্তাটি পেশ করবো ইনশাআল্লাহ।
হযরতে সঙ্গে কথা বলতে ও শুনে যেতে ইচ্ছে করছিলো। কিন্তু রাশেদ ভাইয়ের কল পেয়ে তাকে নিতে চলে গেলাম প্লাটফর্মের বাইরে। প্রহরীরা তাকে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। অনেক বুঝিয়ে তাকে নিয়ে যখন হযরতের দিকে রওয়ানা হলাম, দেখলাম- হযরত ইমিগ্রশনের দিকে এগিয়ে চলছেন। দৌড়ে গিয়ে সালাম করার চেষ্টা করলাম। সফল হলাম না। ততক্ষণে তারা সীমা পার করে ফেলেছেন। আর এই সাক্ষাতটি এভাবে অসমাপ্ত রয়ে গেলো। হয়তো এটি আবারও সাক্ষাত লাভের ইঙ্গিত বহন করে। হয়তো তাঁর স্মরণ যেন জিইয়ে থাকে হৃদয়ে।
তবে আমার বেশি খারাপ লেগেছিলো রাশেদ ভাইয়ের জন্য। বেচারা হযরতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারলেন না। কিন্তু বোধ করি, তিনি সওয়াবের অধিকারী হবেন ইনশাল্লাহ। আল্লাহ সবাইকে কবুল করুন।
।।কাতার সফরের দিনলিপি-২।।
রিয়াদ
১৯/০১/২০২৫
