বাংলাদেশের মুসলমানরা মজলুম ও মাহরুম


 

গত শতাব্দীর আশির দশকটা বাংলাদেশের ইসলামী ইতিহাসের ছিল উজ্জ্বল অধ্যায়। সত্তরের আগে-পরে ধাক্কা খেয়েও মুসলমানরা একটু দাঁড়াতে পেরেছিল। কারণ তখন যোগ্য, নিষ্ঠাবান এবং কর্মঠ নেতৃত্ব ছিলেন। হজরত হাফেজ্জী হুজুর থেকে নিয়ে মাওলানা আবদুর রহীম সাহেব পর্যন্ত বাংলাদেশের ইসলামী ইতিহাসের বিখ্যাত মানুষগণ মাঠে সরব ছিলেন। মুসলমানদের মধ্যে ঈমানী, ইসলামী, আখলাকী এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রে ইসলামকে গ্রহণ করার একটা আন্দোলন চলছিল তখন। সে সময়কার একটা বক্তব্য হলো ‘বাংলাদেশের মুসলমানরা মজলুম এবং মাহরুম’। বক্তব্য পেশ করেছিলেন মাওলানা আব্দুর রহীম (রাহি.)। এই বক্তব্যে মাদরাসার শিক্ষার্থীদের খেতাব করা হয়েছে বিশেষভাবে। এটা নিছক একটা বক্তব্য নয়। বাংলাদেশের নিকট অতীত এবং তাঁর সময়কার পর্যন্তের ইতিহাসের খোলাসা বলা যেতে পারে। ১৮-০৬-১৯৮৪ সালে ঢাকায় প্রদত্ত এই বক্তব্যের সারনির্যাস পেশ করা হলো-

।।১।।
তিনি বক্তব্য শুরুতেই বলেন : বাংলাদেশের মানুষ আজ মজলুম এবং মাহরুম। মজলুম কীভাবে? তাদের অত্যাচার-জুলুম করা হচ্ছে। মাহরুম কীভাবে? যা প্রাপ্য তা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। মুসলমান জাতি হিসেবে আমাদের প্রাপ্য হলো, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদর্শই হওয়া উচিত ছিল আমাদের জাতীয় আদর্শ। কিন্তু তা থেকে আমাদের দূরে রাখা হচ্ছে। বরং এর জন্য আমাদের উপর জুলুম-অত্যাচারও চালানো হচ্ছে।তিনি প্রশ্ন রাখেন- "ইংরেজদের রেখে যাওয়া সব ব্যবস্থাই যেখানে সচল, সেখানে আমরা স্বাধীন কীভাবে? এ-বিষয়টি সবিস্তারে আলোচনা করেন। জাতীয় আদর্শ না থাকায় এদেশের ক্ষমতার হাত বদল হয়েছে কিন্তু জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন হয় নি। এই ঐতিহাসিক সত্যটির সপক্ষে ইতিহাসে থেকে প্রমাণ করেন।
।।২।।
তিনি বলেন- "ইংরেজ আসার পূর্বে এদেশের শিক্ষা সংস্কৃতি ছিল ইসলামী। ইংরেজরা এখানে মদ-বেহায়াপনার সংস্কৃতি চালু করেছে। যা পাকিস্তান হওয়ার সাথে আরও ব্যাপক আকার ধারণ করে । আজ তো আরও বেড়েছে।" আমাদের এই সময়ের সাথে কী আর তুলনা করবো। পাঠক চিন্তা করলেই বুঝতে পারবেন।
তিনি বলেন, "আমরা চরিত্রহীন হয়ে পড়েছি। সবচে দুঃখের বিষয় হলো, এই অবনতির পথকে উন্নতির উপায় হিসেবে আখ্যা দেওয়া। মনে রাখবেন চরিত্রহীন কোন জাতি দুনিয়াতে ঠিকতে পারে না। কুরআন আমাদের এই কথা বলছে । রোমান ও পারস্য সভ্যতা ধ্বংস হয়েছে চরিত্রের নষ্ট হবার কারণেই। মুসলমানদের নৈতিক অধঃপতনই তাদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ। আজ আমরা সে অধঃপতনের দিকেই বাড়ছি।
মূলত মুসলমান জাতি হিসেবে কোন জাতি যেন এ দুনিয়ায় থাকতে না পারে - সে জন্য এই চক্রান্ত । দুশমনরা চায়- মুসলমানরা যেন গরু-ছাগলের মত চলে।
।।৩।।
আমরা কি জাতি মুসলমান, বাঙালি, না বাংলাদেশী? এটি সংক্ষেপে কিন্তু সুন্দরভাবে উঠে এসেছে এ-বক্তব্যে। বাঙালি বানানোর কী চক্রান্ত চালানো হচ্ছে তাও বর্ণনা করেছেন তিনি। বাংলাদেশে ইসলাম ব্যতিত অন্যান্য যেসব মতবাদের চর্চা করা হয়েছে, তার মাধ্যমে বাংলাদেশের শুধু মুসলমান নয়, সমগ্র জনগণের কী পেয়েছে, কী হারিয়েছে তা পর্যালোচনা করেন। পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ এবং গণতন্ত্র কী ভূমিকা রেখেছিল তারও বর্ণনা দেন তিনি। এক কথায় এগুলো এই দেশের মুসলমানের কোন লাভ করতে পারে নি।
পুঁজিবাদের কল্যাণে ধনী হয়েছে আরও ধনী, গরীব হয়েছে আরও গরীব।
সমাজতন্ত্র জনগণের সব সম্পত্তির মালিক বানিয়েছে ‘সরকার’ এ থাকে কিছু মানুষকে।
ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের দোহাই দিয়ে মুসলমানদেরই রাখা হয়েছে ইসলাম থেকে অনেক দূরে।
আর গণতন্ত্রের কল্যাণে শেষ করা হয়েছে জনগণের অধিকার।
এই বক্তব্যে তিনি বলেন- "যারা গণতন্ত্রের মাধ্যমে ইকামাতে ইসলামের স্বপ্ন দেখছেন তা স্বপ্নই রয়ে যাবে চির দিন।" এই কথার সপক্ষে নিজ জীবনের অভিজ্ঞতা পেশ করেন।
ইকামাতে ইসলামের নববি পন্থা তুলে ধরেছেন দারুণভাবে। পেশ করেন প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা। সাথে খেতাব করা হয়েছে যারা চান এদেশে ইসলামী আদর্শ বাস্তবায়নে সচেষ্ট তাদের। তাদের ভুল-ত্রুটিগুলো ধরিয়ে দিয়ে সংশোধনের আহবান জানান।
সর্বশেষ মাদরাসা-ছাত্রদের বাংলা ভাষায় ভালো লেখা ও বলার প্রতি জোর দেন। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পর্কে জানার জন্যও উৎসাহ প্রদান করেন।

মাওলানার এই সংক্ষিপ্ত বয়ানটি আমি মনে করি আজকের এই দিনেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ শুধু ডিজিটাল মোড়কে সজ্জিত হওয়া ছাড়া এ-দেশের কিছুই পরিবর্তন হয় নি। বরং, তখন তো জাতিকে দিকনির্দেশনা দেবার মত নিষ্ঠাবান, যোগ্য, দূরদর্শী নেতৃত্ব ছিলেন। আর এখন? হয়তো আছেন। আমরা তাদের চিনি না। বা তাদের কথা শুনি না।
বাংলাদেশের মুসলমানদের, মুসলিম লিডারশিপদের কীভাবে কাজ করতে হবে তার কিছুটা হলেও দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে এই ছোট্ট পুস্তিকায়। ইসলাম, মুসলমান এবং এই দেশ নিয়ে যারা স্বপ্ন দেখেন তাদের এটি পড়ার, চিন্তা করার এবং ইতিহাসের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পয়েন্টগুলো একত্রিত করে নতুন কর্ম-পরিকল্পনা প্রস্তুত করার বিনীত আবেদন রইল।