হযরত থানবীর রাজনৈতিক চিন্তাধারা


 

বাড়াবাড়ি খুব জঘণ্য একটি বিষয়। বহু জাতি ধ্বংস হয়েছে এই দোষটির অভিশাপে। যে কোনো বিষয়ে হতে পারে এই প্রান্তিকতা-বাড়াবাড়ি। ব্যক্তিজীবন থেকে রাজনীতি পর্যন্ত সবকিছুতেই। হিজরী সন চৌদ্দ শতাব্দিতে খোদ ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত বিভিন্ন মহলে রাজনীতি নিয়ে শুরু হয় এক আজব প্রান্তিকতা। ঠিক সেই সময় দুই প্রান্তের মধ্যমপথটি বের করতে মাঠে এলেন হযরত আশরাফ আলী থানবী রহ.। তাঁর নামই তাঁর পরিচয়। তিনি তাঁর বিভিন্ন বক্তব্য ও রচনায় রাজনীতি বিষয়ে ইসলামী শরীয়ার আলোকে নিজের চিন্তাধারা জানির সামনে তুলে ধরেন। হযরত এই রাজনৈতিক চিন্তাধারার সারাংশ তুলে ধরেছেন শায়খ মুফতি তকী উসমানী হাফিজাহুল্লাহ তার 'হাকিমুল উম্মত কে সিয়াসি আফকার' নামক পুস্তিকায়। মূল পুস্তিকা এখান থেকে ডাউনলোড করে নিতে পারেন। 

এই পুস্তিকাটির অনুবাদ করেছেন সুসাহিত্যিক মুহাম্মদ যাইনুল আবেদীন। এই বইটির আলোকে আজকের লেখাটি তৈরি করা হয়েছে।

পুরো বইয়ে তিনটি পয়েন্টের উপর আলোচনা করা হয়েছে।

ক. ইসলামে রাজনীতির স্থান,
খ. ইসলামের রাষ্ট্রনীতি কী? ইসলামে সরকারের কী দায়িত্ব?
গ. প্রচলিত বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিকোণ কী?

১. ইসলামে রাজনীতি স্থান: এই বিষয়ে ময়দানে যে বাড়াবাড়ি বা প্রান্তিকতা দেখা যায়, তা চিহ্নিত করেন। উভয় প্রান্তের ভ্রান্তি ধরিয়ে দেন। এরপর 'মধ্যপন্থা' পেশ করেন। তিনি বলেন, "ইসলামের সাথে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। এটি খ্রিষ্টানদের চিন্তাধারায় প্রভাবিত ব্যক্তির মতামত। ‘কায়সারের অধিকার কায়সারকে দাও, গীর্জাকে দাও গীর্জার অধিকার’। যার সারমর্ম হলো- রাজনীতিতে ধর্মের কোনো বালাই নেই। (পৃ. ১৪)
বলাবাহুল্য ইসলামে এই চিন্তার কোনো স্থান নেই। ইসলাম সার্বজনিন, সর্বকালীন। ইসলাম সম্পূর্ণ জীবনবিধান। রাজনীতিও এর বাইরে নয়।
দ্বিতীয় মতটি হলো, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই ইসলামের মূল টার্গেট, নবীদের বুনিয়াদী লক্ষ্য; অভীষ্ট কামনা ও কাঙ্ক্ষিত মনযিল। বরং মানবসৃষ্টির লক্ষ্যই হলো, রাজনীতি ও হুকুমত প্রতিষ্ঠা। আর ইসলামের বিধি-বিধান এর পরের স্তরে। বিধি-বিধান রাজনীতি ও হুকুমত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমমাত্র।
হযরত থানবীর মতে, এটিও ভ্রান্ত ও ভ্রষ্ট মতামত। এই চিন্তাধারার প্রধান ক্ষতি হলো, এর কারণে ইসলামী বিধি-বিধানের যথার্থ অবস্থানটা (Order of Priority) বদলে গেছে। দ্বিতীয় ক্ষতি হলো, তাদের মতে যেহেতু রাজনীতিই মূল উদ্দেশ্য, আর প্রয়োজনের সময় মাধ্যম-উপকরণের গলায় ছুরি দেওয়া যায়। সুতরাং, জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে এ-কথার বিরাট সুযোগ সৃষ্টি হলো যে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের স্বার্থে ইবাদত ও অন্যান্য আহকাম পালনে যদি কোনো ত্রুটি হয়েও যায় তবুও সেটা দোষণীয় নয়।
এরপর হযরত এই প্রান্তিক মতটির খণ্ডন করেন।
এরপর এ-বিষয়ে তাঁর মতামত পেশ করেন। তার দৃষ্টিভঙ্গি হলো, ইসলামের মূল লক্ষ্য রাজনীতি নয়, বরং, আল্লাহর সন্তুষ্টি। যদি রাজনীতি বা রাজনৈক কর্মকাণ্ডের কারণে ইসলামের সামান্যতম হুকুমে বেঘাত ঘটে, তাহলে এমন রাজনীতির কোনো মূল্য নেই আল্লাহর কাছে।

২. ইসলামের রাষ্ট্রনীতি কী? এ-ক্ষেত্রে যা লেখা হয়েছে তার সারাংশ হলো, রাজনীতির অঙ্গনে বহুল প্রচলিত দুটি ধারা রয়েছে।
প্রথমটি হলো একনায়কতন্ত্র তথা মধ্যযোগীয় স্বাধীন বাদশাহী। বাদশার একচ্ছত্র ক্ষমতা, জুলুম-নির্যাতনের মতো শত দোষের কারণে এটি সর্বমহলে নিন্দিত হলো।
দ্বিতীয়টি হলো গণতন্ত্র। বর্তমান বিশ্বে রাজনীতির ময়দানে এটাকেই ন্যায়-নীতি ও সততার বাহক ও প্রতীক বলে মানুষ মনে করে। যেসব রাজনৈতিক দল ইসলামের নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই বিষয়ে তারাও পিছিয়ে নেই। তারা দাবি করছে, গণতন্ত্র একান্তই ইসলাম সমর্থিত, সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। বরং ইসলাম গণতন্ত্রের শিক্ষা দিয়েছে। যারা একটু বেশি সতর্ক তারা বলেন, গণতন্ত্রের যেসব বিষয় ইসলামবিরোধী, আমরা সেগুলো স্বীকার করি না। তাই আমাদের গণতন্ত্র ইসলামী গণতন্ত্র। এ-সম্পর্কে শায়খ ত্বকি উসমানী হযরত থানবীর চিন্তাধারা বর্ণনা করে বলেন, হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রহ. এক পলকের জন্যেও একথা মেনে নেননি, ইসলাম গণতন্ত্রের শিক্ষা দিয়েছে; কিংবা গণতন্ত্র সরাসরি ইসলাম মুতাবিক। বরং তিনি বিভিন্ন আলোচনায় গণতন্ত্র সম্পর্কে অত্যন্ত প্রাণবন্ত সমালোচনা করেছেন এবং নিজস্ব ধর্মীয় চেতনার নিরিখে গণতন্ত্রের মন্দ দিকগুলো পরিষ্কার ভাষ্যে তুলে ধরেছেন। (পৃ. ২১)
এরপর উসমানী সাহেব বিভিন্ন সূত্র দিয়ে তা বিস্তারিত আলোচনা করেন। এর কারণ হলো গণতন্ত্রে অধিকাংশের রায়কে নাউজুবিল্লাহ খোদার মর্যাদায় তুলে ধরা হয় যে এই রায় কখনো বাতিল হবার নয়। হযরত থানবী রহ. বলেন-
অধিকাংশের মত কখনো সত্যের মানদণ্ড হতে পারে না। এর সপক্ষে তিনি কুরআনের (সূরা আন’আম : ১১৬) আয়াত পেশ করেন। সাথে বলেন, উহুদ যুদ্ধের যে পঞ্চাশ জনকে পাহাড়ের উপর দাঁড় করানো হয়েছে তাদের মধ্যে অধিকাংশের রায় ছিল ভুল। অধিকাংশের বিপরীতে একজনের রায়ও সঠিক ও সত্য হতে পারে। যেমন, আবু বকর সিদ্দীক রা. এর একক মতামত। ইত্যাদি...। বিভিন্ন প্রসিদ্ধ রাজনীতি বিশারদ যেমন, এ্যাকম্যান্ডবোর্ক, ভারতের ড. এ. আপাদো রায়, পাশ্চাত্যে ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক ‘কারলাইল’ প্রমুখের উক্তি উল্লেখ করে হযরত থানবীর মতকে শক্তিশালী করেন লেখক।

এরপর এ-বিষয়ে হযরত থানবীর চিন্তাধারা তুলে ধরা হয়। হযরত থানবীর মতে, ইসলামের রাজনীতি হলো এককতন্ত্র। কিন্তু তা তথা-কথিত একনায়কতন্ত্র নয়। বরং, খলিফাকে ঘিরে যে তন্ত্র চলে তা এখানে উদ্দেশ্য। যেখানে পার্লামেন্ট সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী নয়। বরং মোটামুটি মালিক হন খলিফা বা আমিরুল মু’মিনিন। যিনি আহলে হল ওয়াল আকদ কর্তৃক যোগ্যতা ও নির্ধারিত গুণাবলির ভিত্তিতে নির্বাচিত হন। অধিকাংশের রায়ের ভিত্তিতে নয়। যেখানে রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি নির্দেশ এবং তার রচিত প্রতিটি সংবিধান কুরআন ও সুন্নাহর অধিনে হতে হবে। মোট কথা হযরত থানবী রহ যে একনায়কতন্ত্রের কথা বলেছেন যেখানে প্রাচীনকালের রাজা-বাদশাহ; নব্যযোগের অত্যাচারী শাসক-গোষ্ঠী এবং ডিক্টেটরনীতির আপত্তিকর ধ্বংসাত্মক বিষয়াবলীর কোনো স্থান নেই। (পৃ. ৩০-৩১) এরপর হযরতের বিভিন্ন রচনা থেকে একনায়কতন্ত্রের সপক্ষে উদ্ধৃতি আনা হয়।

এরপর সরকারের কর্তব্য কী?
ক. শাসন-ক্ষমতাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উপায় বানানোর লক্ষ্যে ইসলামী বিধান মতো আমল করা।
খ. প্রতিটি কর্মসূচীকে যাচাই-বাছাই করা এবং শরীয়তের আনুগত্যের ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র অনীহা প্রদর্শন না করা।
গ. নিজে ন্যায়ের উপর অটল থাকবে। সাথে তার অধিনস্থ কাউকে অবিচার করতে দিবে না।
ঘ. ইসলামী শাসন-ব্যবস্থায় শাসক ও উলামা শ্রেণীর মাঝে কর্মবন্টন হওয়া উচিত।
ঙ. বৈধ সীমায় থেকে বুদ্ধিজীবীদের এবং অভিজ্ঞ লোকদের পরামর্শ নেয়াও শাসকদের কর্তব্য।

৩. এই পয়েন্টে প্রচলিত বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিকোণ উল্লেখ করা হয়।
ক. এ-ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ের উপর আলোচনা করা হয় তা হলো- একটি প্রকৃত ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং অনৈসলামিক শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা কি মুসলমানদের কর্তব্য? যদি কর্তব্য হয়, তাহলে এর সীমারেখা কী? মুফতি তকী উসমানী দা. বা. হযরত থানবী ‘আর-রাওদাতুন নাযেরা ফিল মাসাঈলিল হাযেরা’ পুস্তিকার আলোকে বিষয়গুলো স্পষ্ট করেন। যার সারাংশ হলো- কাফির সম্প্রদায়ের প্রতিরোধ করা ইসলামী রাষ্ট্রের উপর ফরয। চাই তা খিলাফত ব্যবস্থাপনা কিংবা নামের মাত্র ইসলামী রাষ্ট্র হোক। কিন্তু এই বিষয়টি শর্ত-সাপেক্ষ। এখানে দুটি শর্ত বর্ণিত হয়েছে। এক. সামর্থ থাকা। দুই. প্রতিরোধের পর পূর্বের তুলনায় অবস্থা মারাত্মক না হওয়া। এ-ধরণের শর্ত পাওয়া না গেলে প্রতিরোধ ফরয থাকবে না। তবে তা কি মুস্তাহাব বা অবৈধ হওয়ার বিষয়টি নির্ভর করে ‘ইজতিহাদের’ উপর। (পৃ. ৪৫-৪৬)

খ. এরপর খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে আলোচনা করা হয়। তা হলো, ইসলামী রাজনীতি কোত্থেকে শুরু করা উচিত? এ-বিষয়ের সারাংশ হলো, রাজনৈতিক প্রচেষ্টা-তদবীরের প্রথম শর্ত হলো, মানুষের আমল-চরিত্র পরিশুদ্ধ হওয়া। মক্কী জীবনের ১৩ বছর এ-কাজটিই করা হয়েছে। এরপরই মাদানী জীবনে শুরু হলো রাজত্ব ও জিহাদের মধ্য দিয়ে।

গ. এরপর বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনা করেন। এ-ক্ষেত্রে হরতাল, অনশন ধর্মঘট, পাবলিসিটি সম্পর্কে স্পষ্ট ভাষায় ইসলামী বিধান বর্ণনা করেন।
ঘ. শেষের দিকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় একটু বিস্তারিত আলোচিত হয় তা হলো, সরকারের সাথে আচরণ কেমন হওয়া চাই? বর্তমানে খুবই প্রয়োজনীয় একটি প্রসঙ্গ হলো সরকারের সাথে মুসলমানদের আচরণ কেমন হওয়া চাই? ইসলামবিরোধী আইন ও পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কী করতে হবে, সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ কখন করা যাবে বিষয়েও স্পষ্ট বর্ণনা দেন। এই জটিল বিষয়টিও স্পষ্ট ও সাহসিকতার সাথে জাতির কল্যাণে তুলে ধরার কারণে আল্লাহ হযরত থানবী এবং লেখককে উত্তম প্রতিদান দান করুন। সাথে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছি সফল অনুবাদক মুহাম্মদ যাইনুল আবেদীন হাফি. এর প্রতি। তিনি এই সুন্দর এই অনুবাদের জন্য।