অভিনব শিক্ষা-শহরে কিছুক্ষণ



।।১।।

হযরতের সাক্ষাৎ ছিলো কয়েক মিনিটের । কিন্তু প্রশান্তির পরশ হৃদয় ছুঁয়ে গেলো। বিদায় যত কষ্টের হোক তা মানুষকে মেনে নিয়ে সামনে অগ্রসর হতে হয়। বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে আমাদের গন্তব্য প্রথমে ‘আওকাফ’ এর কার্যালয়। কাতার আওকাফের একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ, তারা ঐতিহাসিক ক্লাসিক ও আধুনিক গ্রন্থ চেপে বিনামূল্যে বিতরণ করে। বিতরণের ক্ষেত্রে তারা অনার্স, মাস্টার্স আর ডক্টরেট পর্যায়ের ছাত্রদের জন্য কিছু নির্ধারিত গ্রন্থ, অন্যান্য ইসলামি ব্যক্তিবর্গের জন্য পৃথক গ্রন্থ বিতরণ করে থাকে। তালিকায় কী কী গ্রন্থ আছে, ভুলে গেছি। তবে অনেক মূল্যবান কিতাব রয়েছে তাদের কেউ কাতার ভ্রমনে গেলে, অবশ্যই আওকাফের গ্রন্থগুলো সংগ্রহ করবেন। আমি শায়খ ত্বকী উসমানীর ‘ফিকহুল বুয়ু’, ইমাম নববীর ‘আল আযকার’ এবং আরও কিছু মূল্যবান কিতাব পেয়েছিলাম। এক্ষেত্রে আওকাফে কর্মরত এক বাংলাদেশী ভাইয়ের শুকরিয়া আদায় করতেই হয়।


।।২।।

থলে ভরতি কিতাব নিয়ে আওকাফ থেকে বের হতে প্রায় জোহরের সময় হয়ে যায়। এবার গন্তব্য কাতার ‘এডুকেশন সিটি’। লম্বা সময়জুড়ে ছিলাম এখানে। ‘এডুকেশন সিটিতে’তে অনেকগুলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ভার্সিটির সমাহার। জাতীয় লাইব্রেরিটিও এখানে। বিশাল এলাকাজুড়ে এই ‘শিক্ষা-এলাকা’। তবে আমি ৩টি স্থানের কথা লিখবো।

এক. মসজিদ যুল মানারাতাইনঃ আধুনিক কারুকার্যে সাজানো এই দৃষ্টিনন্দন মসজিদটি দুই মিনারা বিশিষ্ট। তাই তার নাম মসজিদ যুল মানারাতাইন। মসজিদটি মূলত ইসলামি ক্লাসিক শিল্পকলা ও আধুনিক সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এর দারুণ সমন্বয়ে নির্মিত। ফলে চতুঃপার্শ্বে নজর কাড়া ইসলামি ক্যালিগ্রাফিতে সাজানো কুরআনের আয়াত ও রাসুলের বিভিন্ন হাদিস। ‘হামদ বিন খলিফা ইউনিভার্সিটি’র ইসলামি স্টাডিজের ক্যাম্পাসের পাশেই এই মসজিদ। যেনবা ইবাদত ও ইলম এক স্থানে একত্রিত করাই উদ্দেশ্য ছিল কর্তৃপক্ষের। অবাক করা বিষয় হলো, মসজিদের ভিত্তি ৫ স্তম্বের উপর। প্রতিটি স্তম্বে ইসলামের একেক রুকন লিপিবদ্ধ করা। ইসলামের পঞ্চ-স্তম্বের দিকে ইঙ্গিত করেই এই ডিজাইন।



যোহর আদায় করে রূহানী প্রশান্তি লাভের মনোরম এই স্থানে কিছুক্ষণ  সময় উপভোগ করলাম। মসজিদের ভেতর বিশাল জায়গা। যতটুকু মনে পড়ছে বাম পাশে ছোট ছোট কিছু রুম রয়েছে হয়ত সেখানে কুরআনী হালকা বসে সেখানে। ঠিক জানি না।

এখান থেকে হামদ বিন খলিফার ক্যাম্পাসে একটু ডু মেরে চলে যায় ভার্সিটির অ্যাডমিশন ডিপার্টমেন্টে। এটি ক্যাম্পাস থেকে বেশ দূরেই অবস্থিত। তবে যাতায়াতের জন্য এখানে মেট্রো রয়েছে। মেট্রোতে করে কাছে একটি স্টেশনে নেমে হাটা দিলাম অ্যাডমিশন ডিপার্টমেন্টে। উদ্দেশ্য- ভর্তি সম্পর্কে কিছু তথ্য সংগ্রহ করা।  দায়িত্বে থাকা  তিউনিসিয়ার এক ভদ্র মহিলা কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে কয়েকজন ডক্টরের নাম করে তাদের সাথে সাক্ষাৎ করতে বললেন।

দুই. আবার হাটা দিলাম ইসলামিক স্টাডিজ ক্যাম্পাসের দিকে। পথে সুবিশাল স্টুডেন্ট ক্লাব নজরে পড়লো। কয়েক মিনিটের জন্য প্রবেশ করলাম। ভালো লেগেছিলো। ক্যাম্পাসে পৌঁছে যেসব প্রফেসরদের সাথে দেখাতে করার কথা তাদের অন্যতম প্রসিদ্ধ সিরিয়ান লেখন মু’তায আল খাতীব ও মিসরের ডক্টর জামাল। খুব অল্প সময়ই তাদের সাথে কথা হয়েছিল। তবে তাদের সাক্ষাত হৃদয়ে গভীর কোনো প্রভাব ফেলে নি। মু’তায আল খাতিব সাধারণভাবে কিছু প্রশ্নের উত্তর দিলেন। আরও কিছু কথা বলতাম তার সম্পর্কে কিন্তু অল্প সময়ের সাক্ষাতে কাউকে জাজ করা উচিত না। তা কিছু আমার মনে হয়েছে হয়ত বাস্তবে এমনটা নাও হতে পারে।

সাক্ষাৎ পর্ব সেরে  লাইব্রেরির দিকে গেলাম। লাইব্রেরির আধুনিক ডিজাইন, গবেষণার বিভিন্ন উপকরণ, সেমিনার রুম এবং গবেষকদের জন্য প্রাইভেট পড়ার রুম সব রয়েছে এখানে। তবে গ্রন্থ ভাণ্ডার তেমন সমৃদ্ধ ছিলো তখনো। ছাত্র-ছাত্রীর জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা নেই। পরে শুনলাম, ক্লাসও একসাথে।

দুপুরে খাবার হয়নি এতক্ষণ। আসর সময় হতে আর বেশি দেরি নেই। লাইব্রেরিতে বসা এক পাকিস্তানী ভাইয়ের কাছ থেকে রেস্টুরেন্টের লোকেশন জানতে চাইলাম। কিন্তু তিনি আমাকে লোকেশন বললেন। কিন্তু বিভিন্ন বিষয়ে আরও কিছুক্ষণ কথা বলে বিদায় নেওয়ার সময় আচমকা আবদার করে বসলেন- কিছু মনে না করলে আমি গিয়ে আপনার জন্য খানা নিয়ে আসি। আমি প্রথমে বুঝিনি যে তিনি আপ্যায়ন করার কথা বলছিলেন । বললাম, আমিও যাই তাহলে। তিনি বললেন, আপনার যাওয়ার দরকার নেই। আমি টাকা দিতে চাইলাম। কিন্তু না নিয়েই চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর খাবার নিয়ে উপস্থিত হলেন। বললেন- এই সামান্য জিনিস আপনার আপ্যায়নের জন্য। আমি শুকরিয়া বলে গ্রহণ করলাম। খাওয়ার পুরো সময়জুড়ে চিন্তা করছিলাম রিযিকদাতা আল্লাহর ব্যাপারে। কী আজীব পন্থায় তিনি আমাদের রিযিকের ব্যবস্থা করেন। আরও ভাবছিলাম- ইসলামি ভ্রাতৃত্বের কথা। জানা নেই শোনা নেই কোথাকার কাকে এত সুন্দর আচরণ এবং আপ্যায়ন এটাই ইসলামি ভ্রাতৃত্ব। একমাত্র ইসলামই এমন শিক্ষা দেই। অন্যান্য সভ্যতায় সুন্দর আচরণের শিক্ষা আছে। কিন্তু এত ডিটেইল এবং ডীপ নয়।

আসর নামাজ পড়ে কথা বলছিলাম আফ্রিকার এক ছাত্রের সঙ্গে। জেনে অবাক হলাম সে আমাদের ভার্সিটি থেকে গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করে ওখানে মাস্টার্স করছেন। তার সঙ্গে ভার্সিটিতে পড়াশুনা, সুযোগ-সুবিধা ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত কথা হয়। তার কথাবার্তা ছিলো শুদ্ধ আরবিতে। আচরণ ছিলো ভদ্রতাপূর্ণ। তার কিছুক্ষণের সঙ্গ এই মুসাফিরের ক্লান্তি কিছুটা হলে দূর হয়েছিল।

মাগরিব আদায় করে কয়েকটি ক্লাসরুম এক নজর দেখি। বেশ ভালোই লেগেছিলো। ক্লাসরুমের পাশে রাখা স্বয়ংক্রিয় কপি মেশিনের এক কাপ কপি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম পরবর্তী গন্তব্যে।


তিন. এবারের গন্তব্য কাতার জাতীয় লাইব্রেরি। এক কথায় অসাধারণ। মালয়েশিয়ার Raja Tun Uda Library পর এই প্রথম ভালো লাগার মত একটি লাইব্রেরি দেখলাম।




লাইব্রেরি বরাবর আমার কাছে এক ভালোলাগার জায়গা। আর এই কাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরি তো এক নতুন অভিজ্ঞতা। কী নেই এখানে। শিক্ষা, বিনোদন, রিফ্রেশমেন্ট সব কিছুর উপকরণে ভরা এই লাইব্রেরি। মানুষের উপস্থিতও চোখে পড়ার মত। আমি এর আগে কোনো পাবলিক লাইব্রেরিতে এত ভিড় দেখি নি। মনে দোহায় অবস্থানরত প্রবাসীরা তাদের অবসর সময় কাটাতে এখানেই আসে।



আমি ঘণ্টা খানেক ছিলাম লাইব্রেরিতে। ইচ্ছা থাকলেও বেশিক্ষণ থাকা যায় নি। কারণ ইশার পর আমাদের যেতে হবে শ্রদ্ধেয় হুসাইন মুহাম্মদ নাঈম হাফি. এর বাসায়। কাতার এসেই তার সাথে যোগাযোগ করেছিলাম। তিনি স্বাগতম জানিয়েই সানন্দে দাওয়াত দিয়ে রেখেছিলেন কাতারে আসার প্রথম দিনই। ইশার সালাত মসজিদ যুল মানারাতাইনে আদায় করে বেরিয়ে পড়লাম শায়খের বাসার দিকে। তার সাক্ষাৎ, কথোপকথন ইত্যাদি  নিয়ে আরেকটি পোস্টে বিস্তারিত লিখবো ইনশাআল্লাহ।


।।কাতার সফরের দিনলিপি-৩।। 

রিয়াদ

২১/০১/২০২৫