মায়ের সঙ্গে খারাপ আচরণের পরিণাম
মালিক ইবনু দীনার
(রহ.) একজন তাবেয়ী। ইবনুল জাওযী তাঁর আল-বিররু ওয়াস-সিলাহ গ্রন্থে তাঁর নিজের একটি
ঘটনা উল্লেখ করেছেন। নিচে ঘটনাটির অনুবাদ দিলাম। হৃদয়বানদের জন্য এতে চিন্তার
খোরাক রয়েছে।
মালিক ইবনু দিনার (রহ.) বলেনঃ একদিন আমি বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করছিলাম। হাজি ও উমরাহকারীদের বিপুল সমাগম দেখে আমার খুব ভালো লাগছিল। মনে মনে বললাম, হায়! তাদের মধ্যে কার হজ কবুল হয়েছে- যদি জানতাম, তাকে আমি অভিনন্দন জানাতাম। আর কার হজ প্রত্যাখ্যাত হয়েছে- যদি জানতাম, তাকে সান্ত্বনা দিতাম।
ঐ রাতে আমাকে স্বপ্নে দেখানো হলো, কে যেন বলছে: “হে মালিক ইবনু দিনার! তুমি হাজি ও উমরাহকারীদের নিয়ে চিন্তা করছ? আল্লাহর কসম! আল্লাহ তাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিয়েছেন- ছোট-বড়, নারী-পুরুষ, কালো-সাদা, আরব-অনারব- সকলকে। তবে একজন ছাড়া। আল্লাহ তাআলা তার ওপর অসন্তুষ্ট; তার হজ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে এবং তা তার মুখের ওপর ছুড়ে মারা হয়েছে।” মালিক বলেন, আমি সেই রাতে কীভাবে কাটালাম আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। আমার ভয় হচ্ছিল, আমি যেন সেই লোক না হই!
দ্বিতীয় রাতে আবার একই স্বপ্ন দেখলাম। তবে এবার আমাকে বলা হলো, “তুমি সে ব্যক্তি নও। সে হলো খোরাসানের একজন মানুষ, বালখ নামক শহরের বাসিন্দা। তার নাম মুহাম্মদ ইবনু হারুন আল-বালখি। আল্লাহ তার ওপর অসন্তুষ্ট; তার হজ প্রত্যাখ্যাত হয়েছে এবং তা তার মুখে নিক্ষেপ করা হয়েছে।”
ভোর হলে আমি খোরাসানের লোকদের গোত্রগুলোর কাছে গেলাম। জিজ্ঞেস করলাম, “আপনাদের মধ্যে কি বালখের লোক আছে?” তারা বলল, “হ্যাঁ, আছে।” আমি তাদের কাছে গিয়ে সালাম দিলাম এবং বললাম, “আপনাদের মধ্যে কি মুহাম্মদ ইবনু হারুন নামে কেউ আছেন?” তারা বলল, “ওহ, হে মালিক! আপনি এমন একজন মানুষের কথা জিজ্ঞেস করছেন, খোরাসানে তার চেয়ে অধিক ইবাদতকারী, অধিক যুহদ অবলম্বনকারী ও অধিক কুরআন তিলাওয়াতকারী আর কেউ নেই!” তার সম্পর্কে এমন সুন্দর প্রশংসা শুনে এবং স্বপ্নের কথা মনে করে আমি বিস্মিত হলাম। আমি বললাম, “আমাকে তার কাছে পৌঁছার পথ দেখান।” তারা বলল, “তিনি চল্লিশ বছর ধরে দিনে রোজা রাখেন, রাতে ইবাদতে দাঁড়িয়ে থাকেন এবং ধ্বংসস্তূপ ছাড়া কোথাও আশ্রয় নেন না। আমরা ধারণা করি, তিনি মক্কার কোনো পরিত্যক্ত স্থানে আছেন।” আমি ধ্বংসস্তূপগুলোতে খুঁজতে লাগলাম। হঠাৎ দেখি, একটি দেয়ালের পেছনে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। তার ডান হাত কাটা, তা গলায় ঝুলছে; কাঁধের হাড় ফুটো করে তাতে শিকল ঢোকানো হয়েছে; আর পায়ে মোটা দুটি শিকল বাঁধা। তিনি রুকু ও সিজদায় মগ্ন! আমার পায়ের শব্দ টের পেয়ে তিনি ঘুরে বললেন, “তুমি কে?” আমি বললাম, “আমি মালিক ইবনু দিনার।” তিনি বললেন, “হে মালিক! কী কারণে তুমি আমার কাছে এসেছ? কোনো স্বপ্ন দেখেছ? আমাকে বলো।” আমি বললাম, “আপনার সামনে সে স্বপ্ন বলতে লজ্জা লাগছে।” তিনি বললেন, “লজ্জা কোরো না।”
আমি স্বপ্নটি তাকে বললাম। তিনি দীর্ঘক্ষণ কাঁদলেন এবং বললেন, “হে মালিক! এই স্বপ্ন আমাকে গত চল্লিশ বছর ধরে দেখানো হচ্ছে। প্রতি বছর তোমার মতো কোনো যাহিদ ব্যক্তি এই স্বপ্ন দেখে। নিশ্চয়ই আমি জাহান্নামের লোক!”
আমি বললাম, “আল্লাহর সঙ্গে আপনার কি কোনো ভয়ংকর গুনাহ রয়েছে?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ। আমার গুনাহ আসমান, জমিন, পাহাড়, আরশ ও কুরসির চেয়েও বড়!”
আমি বললাম, “আমাকে সেটি বলুন, যাতে আমি মানুষকে সতর্ক করতে পারি, যেন তারা এমন কাজ না করে।”
তিনি বললেন, “হে মালিক! আমি একসময় মদ পান করতাম। একদিন এক বন্ধুর কাছে গিয়ে এত মদ খেলাম যে সম্পূর্ণ মাতাল হয়ে জ্ঞান হারালাম। সেই অবস্থায় বাড়িতে ফিরলাম। দেখি, আমার মা আমাদের চুলা জ্বালাচ্ছেন, যার ভেতরটা সাদা হয়ে গেছে। আমাকে টলতে টলতে আসতে দেখে তিনি আমাকে উপদেশ দিয়ে বললেন: ‘আজ শাবানের শেষ দিন, আর রমজানের প্রথম রাত। আগামীকাল মানুষ রোজাদার হবে, আর তুমি হবে মাতাল! তোমার কি আল্লাহর ভয় নেই?’
আমি হাত তুলে তাকে ধাক্কা দিলাম। তিনি বললেন, ‘তুমি ধ্বংস হও!’ তার এ কথা শুনে আমি আরও রেগে গেলাম। মাতাল অবস্থায় তাকে তুলে নিয়ে চুলার ভেতরে নিক্ষেপ করলাম।
আমার স্ত্রী আমাকে দেখে আমাকে ধরে একটি ঘরে নিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। রাতের শেষভাগে আমার নেশা কেটে গেলে আমি স্ত্রীকে দরজা খুলতে বললাম। সে কঠোরভাবে উত্তর দিল। আমি বললাম, ‘এ কেমন রূঢ়তা! আগে তো এমন রূঢ়তা দেখিনি।’ সে বলল, ‘তুমি এমন আচরণেরই যোগ্য, দয়ার যোগ্য নও।’
আমি বললাম, ‘কেন?’ সে বলল, ‘তুমি তোমার মাকে হত্যা করেছ, তাকে চুলায় নিক্ষেপ করেছ। তিনি পুড়ে মারা গেছেন।’
এ কথা শুনে আমি দরজা ভেঙে চুলার কাছে গেলাম। দেখি, তিনি সেখানে পুড়ে যাওয়া রুটির মতো হয়ে আছেন!
আমি একটি কুঠার দেখলাম। দরজার চৌকাঠে ডান হাত রেখে বাম হাতে তা কেটে ফেললাম। কাঁধ ফুটো করে শিকল ঢুকালাম, পায়ে শিকল পরালাম। আমার সম্পদ ছিল আট হাজার দিনার। সূর্যাস্তের আগেই সব সদকা করে দিলাম। ছাব্বিশ জন দাসী ও তেইশ জন দাসকে মুক্ত করলাম। আমার সব সম্পত্তি আল্লাহর পথে ওয়াক্ফ করে দিলাম। চল্লিশ বছর ধরে দিনে রোজা রাখি, রাতে ইবাদত করি। একমুঠো ছোলা দিয়ে ইফতার করি। প্রতি বছর হজ করি। আর প্রতি বছর তোমার মতো কোনো আলেম এই স্বপ্ন দেখে। নিশ্চয়ই আমি জাহান্নামের লোক।”মালিক বলেন, আমি নিজের হাত দিয়ে নিজের মুখে আঘাত করে বললাম, “হে হতভাগা! তুমি তো তোমার আগুন দিয়ে পৃথিবী ও এর সবকিছুকে পুড়িয়ে ফেলতে বসেছিলে!” আমি সেখান থেকে সরে গেলাম—যেন তার আওয়াজ শুনি, কিন্তু তাকে দেখি না। তিনি আকাশের দিকে হাত তুলে বলছিলেন, “হে দুশ্চিন্তা দূরকারী, হে দুঃখ মোচনকারী, হে অসহায়দের ডাকে সাড়া দানকারী! আমি তোমার সন্তুষ্টিকর মাধ্যমে তোমার অসন্তুষ্টি থেকে আশ্রয় চাই। তোমার ক্ষমার মাধ্যমে তোমার শাস্তি থেকে আশ্রয় চাই। আমার আশা ছিন্ন করো না, আমার দোয়া প্রত্যাখ্যান কোরো না!”
মালিক বলেন, আমি বাড়িতে ফিরে ঘুমালাম। স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে দেখলাম। তিনি বললেন: “হে মালিক! মানুষকে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ কোরো না, তাঁর ক্ষমা থেকে বঞ্চিত কোরো না। আল্লাহ ঊর্ধ্বজগতের ফেরেশতাদের মাঝে মুহাম্মদ ইবনু হারুনের দিকে দৃষ্টি দিয়েছেন, তার দোয়া কবুল করেছেন এবং তার ভুল ক্ষমা করেছেন। তার কাছে যাও এবং তাকে বলো—আল্লাহ কিয়ামতের দিন প্রথম ও শেষ সকলকে একত্র করবেন। শিংবিহীন পশুর প্রতিশোধ শিংওয়ালা পশু থেকে নেবেন। হে মুহাম্মদ ইবনু হারুন! আল্লাহ তোমাকে ও তোমার মাকে একত্র করবেন। তোমার মায়ের পক্ষে রায় দেবেন। ফেরেশতাদের আদেশ দেবেন, তারা তোমাকে শক্ত শিকলে বেঁধে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাবে। তুমি যখন দুনিয়ার তিন দিনের সমান সময় জাহান্নামের আগুনের স্বাদ পাবে, তখন আমি তোমার মায়ের অন্তরে দয়া ঢেলে দেব। তিনি তোমাকে আমার কাছে চাইবেন। আমি তোমাকে তার কাছে সুপর্দ করব। অতঃপর তোমরা দুজনই জান্নাতে প্রবেশ করবে।”
মালিক বলেন, ভোর হলে আমি তার কাছে গিয়ে স্বপ্নের কথা বললাম। মনে হলো, তার জীবন যেন পানিভরা পাত্রে নিক্ষিপ্ত একটি পাথরের মতো থেমে গেল। তিনি সেখানেই ইন্তেকাল করলেন। তার জানাজায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যমে আমিও ছিলাম।
(আল বিররু ওয়াস সিলাহ- ইবনুল জাওযী, ১১৫)
(আল বিররু ওয়াস সিলাহ- ইবনুল জাওযী, ১১৫)
