প্রোপাগান্ডার যুদ্ধ

গালফ যুদ্ধের সময় একবার সিএনএন-এর স্টুডিও থেকে সরাসরি মাঠে থাকা এক সংবাদদাতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলো। উপস্থাপক জানতে চাইলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে থাকা সৈন্যদের সর্বশেষ অবস্থা কী। সংবাদদাতা জবাব দিলেন, “আমরা জানি না; আমরাও তো সবে সিএনএন দেখছিলাম সর্বশেষ খবর জানার জন্য। ঘটনাটি মজার, কিন্তু একই সঙ্গে গভীরভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এটি দেখায়, আধুনিক যুদ্ধে সংবাদমাধ্যম কখনো কখনো কেবল যুদ্ধের খবর দেয় না; বরং যুদ্ধের ধারণা, যুদ্ধের ভাষা এবং যুদ্ধের বাস্তবতাকেও নির্মাণ করে। [1]

এই বৈপরীত্য নিয়েই ভিয়েতনাম যুদ্ধ প্রসঙ্গে মার্কিন সাংবাদিক রবার্ট এলিগ্যান্ট মন্তব্য করেছিলেনইতিহাসে প্রথমবারের মতো যুদ্ধের ফলাফল যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, বরং সংবাদপত্রে এবং তার চেয়েও বেশি টেলিভিশনের পর্দায় নির্ধারিত হচ্ছে। এখানেই প্রশ্ন আসে: গণমাধ্যমের ভূমিকা আসলে কী? কীভাবে গণমাধ্যম যুদ্ধকে বৈধতা দেয়? কীভাবে জনসমর্থন তৈরি করে? কীভাবে তার প্রচার সত্যকে প্রভাবিত করে, মিথ্যা তৈরি করে, এবং কীভাবে সে নির্ধারণ করে কারা সহানুভূতির যোগ্য ভুক্তভোগী, আর কারা শুধুই পার্শ্বক্ষতি? অন্য ভাষায় বললেগণমাধ্যম কীভাবে সম্মতি তৈরি করে? [2]

 

শত্রুর ছবি নির্মাণ: বর্বর, ‘শিশুহত্যাকারী অমানুষ

আমরা দেখেছি তারা শিশুদের হাত কেটে ফেলেছেকেউ কেউ তা খেয়েও ফেলেছে। তারা মায়ের কোল থেকে শিশুদের ছিনিয়ে নিয়েছে। তারা নার্সদের স্তন কেটে দিয়েছে। এই অভিযোগগুলো শুনলে হয়তো সাম্প্রতিক কোনো যুদ্ধের কথা মনে হতে পারে। কিন্তু বিস্ময়কর হলো, এসব অভিযোগ গাজা যুদ্ধের সময় প্রথম ওঠেনি। এগুলো এই শতাব্দীরও নয়। বরং এগুলোর উৎস বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়। তখন অভিযুক্ত ছিল জার্মান সৈন্যরাবিশেষত বেলজিয়ামে তাদের আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে। এই সব গল্পের অনেকটাই ছিল ব্রিটিশ প্রচারযন্ত্রের তৈরি। ব্রিটিশ প্রোপাগান্ডা মন্ত্রণালয় তাদের গোপন নথিতে নিজেদের কাজের লক্ষ্য হিসেবে বলেছিল—“বিশ্বের বৃহৎ অংশের চিন্তাকে পরিচালিত করা। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল না যে এসব গল্প পরে সত্য না মিথ্যা প্রমাণিত হবে। কারণ প্রোপাগান্ডার কাছে সত্য নিজে মুখ্য নয়; মুখ্য হলো নিয়ন্ত্রণ, আতঙ্ক তৈরি এবং জনসম্মতি আদায়। [3]

মিসৌরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক সেলিয়া কিংসবেরি বলেন, প্রোপাগান্ডা নির্মাতার কাছে সত্যের গুরুত্ব খুব সামান্য। কারণ শিশু বা নারীর ওপর ভয়াবহ নির্যাতনের গল্প মানুষের আবেগকে এত প্রবলভাবে নাড়া দেয় যে তা প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। সমাজের ভিত্তি যেহেতু পরিবার, তাই প্রোপাগান্ডা নির্মাতারা প্রায়ই পরিবার-সংক্রান্ত ভয়কে ব্যবহার করে জনতার মনে সামাজিক বিপদের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। [4]

মা থেকে সন্তানকে বিচ্ছিন্ন করা, নারী শিশুর ওপর নির্যাতন, শিশু হত্যাএসব সংবাদ তাই শুধু অপরাধের বিবরণ নয়; এগুলো সমাজের অস্তিত্বের ওপর আঘাত হিসেবে উপস্থাপিত হয়। ফলে কোনো জনগোষ্ঠীকে চরম বিপদের অনুভূতিতে ঠেলে দিতে চাইলে এমন ভয়াবহতার গল্প তৈরি করাই যথেষ্ট। আতঙ্ক ছড়ানো আর সত্য প্রকাশের মাঝের সময়টুকুতে আপনি চাইলে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারেন, নীতি পাস করতে পারেন, গণহত্যা চালাতে পারেনএবং দেখবেন, মানুষ আপনার পেছনে দাঁড়িয়ে গেছে। কারণ গভীর বিপদের অনুভূতিতে তাদের বিচারবোধ সাময়িকভাবে স্থবির হয়ে গেছে।

সম্মতি তৈরির শিল্প: ‘পরম মন্দ আবিষ্কার

এডওয়ার্ড বার্নেইস, যাকে আধুনিক প্রোপাগান্ডা জনসংযোগ তত্ত্বের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়, গণতান্ত্রিক সমাজে জনমত গঠনের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে দেখেছিলেন। তার মতে, মানুষের চিন্তা সমষ্টিগত মনকে সংগঠিত করা আধুনিক সমাজব্যবস্থার একটি কেন্দ্রীয় উপাদান। [5] অন্যদিকে মার্কিন চিন্তাবিদ সাংবাদিক ওয়াল্টার লিপম্যান সম্মতি তৈরি বা manufacture of consent ধারণা তুলে ধরেন। তার মতে, গণমাধ্যমের মাধ্যমে একটি বিশেষায়িত এলিট গোষ্ঠী সাধারণ মানুষের সম্মতি নির্মাণ করেএমন সব মতামতের পক্ষে, যেগুলোর প্রতি তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কখনোই রাজি হতো না। লিপম্যান সাধারণ জনগণকে কখনো কখনো বিভ্রান্ত পাল হিসেবেও দেখতেন। [6]

এই প্রক্রিয়া বিশেষভাবে কার্যকর হয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়। কারণ সেখানে মানুষের ওপর সরাসরি বলপ্রয়োগ করে মত চাপিয়ে দেওয়া সবসময় সহজ নয়। তাই বলপ্রয়োগের বদলে আসে প্রতারণা। মানুষকে এমনভাবে প্রভাবিত করা হয়, যাতে তারা মনে করেএই মতামত আসলে তাদের নিজের স্বাধীন চিন্তার ফল।

এই পুরো ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হলো পরম মন্দ তৈরি করা। জনগণের সামনে এমন এক শত্রু দাঁড় করানো হয়, যার নাম শুনলেই ভয়, ঘৃণা এবং যুদ্ধের পক্ষে নৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্রে প্রথমে সেই শত্রু ছিল প্রথম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জার্মানি। পরে সেই জায়গা নেয় কমিউনিজম, যার নামে বহু যুদ্ধ, হস্তক্ষেপ অভ্যুত্থানকে বৈধতা দেওয়া হয়। এরপর, এডওয়ার্ড সাঈদ তার Covering Islam গ্রন্থে দেখিয়েছেন, সেই শত্রুতে পরিণত হয় ইসলামি সন্ত্রাসবাদ”—যেখানে বিশ্বকে ভাগ করা হয় সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে এবং সন্ত্রাসবাদকে সমর্থনকারী রাষ্ট্রে। [7]

এই জায়গাতেই ইসরায়েলি দখলদার রাষ্ট্র পশ্চিমা প্রোপাগান্ডাকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে চেয়েছে। এডওয়ার্ড সাঈদের ভাষায়, তারা চেয়েছে আরও বেশি আমেরিকান ইউরোপীয় নাগরিককে বোঝাতে যে ইসরায়েল ইসলামি সহিংসতার শিকার। তাই অক্টোবরের পর হামাস ইজ আইসিস ধরনের প্রচারণা ছিল সেই পুরোনো পশ্চিমা প্রোপাগান্ডার সুরে সুর মেলানোর চেষ্টা। উদ্দেশ্য ছিল—‘সভ্যতা বনাম বর্বরতা, ‘আলো বনাম অন্ধকার, ‘অগ্রগতি বনাম পশ্চাৎপদতা’—এই ভাষায় নতুন সম্মতি তৈরি করা। এমনকি শত্রুকে মানবপশু বলেও চিহ্নিত করা হয়, যাতে তার বিরুদ্ধে যে কোনো সহিংসতা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মনে হয়। [7]

কারা ভুক্তভোগী, আর কারা পার্শ্বক্ষতি?

মার্কিন চিন্তাবিদ নোয়াম চমস্কি এবং এডওয়ার্ড হারম্যান তাদের বিখ্যাত প্রোপাগান্ডা মডেলে দেখিয়েছেন, গণমাধ্যম ভুক্তভোগীদের মধ্যেও বিভাজন তৈরি করে। কিছু ভুক্তভোগী হয় যোগ্য ভুক্তভোগী”—যাদের কষ্ট, মৃত্যু, কান্না, পরিবার জীবনের গল্প বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়। অন্যদিকে কিছু ভুক্তভোগী হয় অযোগ্য বা অদৃশ্য ভুক্তভোগীযাদের মৃত্যু কেবল সংখ্যা, পরিসংখ্যান, কিংবা পার্শ্বক্ষতি হিসেবে উপস্থাপিত হয়। [8]

আমাদের পক্ষের এক হাজার নিহত হলে তারা হয় নিরীহ বেসামরিক মানুষ। কিন্তু শত্রুপক্ষের ত্রিশ হাজার নিহত হলে তারা হয়ে যায় কল্যাটারাল ড্যামেজ বা যুদ্ধের অনিবার্য পার্শ্বক্ষতি। গণমাধ্যম এই পার্থক্য তৈরিতে প্রধান ভূমিকা পালন করে।

চমস্কি হারম্যান দেখিয়েছেন, যখন কোনো যোগ্য ভুক্তভোগী নিহত হয়, তখন গণমাধ্যমের ভাষা হয় সরাসরি, আবেগপূর্ণ বিশদ। উদাহরণ হিসেবে তারা পোল্যান্ডের এক যাজক হত্যার ঘটনা উল্লেখ করেন। সে সময় পোল্যান্ড ছিল সোভিয়েত প্রভাবাধীন। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম সেই হত্যাকে স্পষ্ট ভাষায় খুন হিসেবে বর্ণনা করে এবং কীভাবে তাকে মারধর করা হয়েছিল, কীভাবে হাত-পা বাঁধা হয়েছিলএসব বিস্তারিত তুলে ধরে।

কিন্তু বিপরীতে, যখন একজন মার্কিন যাজক হন্ডুরাসে নিহত হনযে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ছিলতখন সংবাদমাধ্যমের ভাষা অনেকটাই অস্পষ্ট হয়ে যায়। বলা হয়, “তার মরদেহ পাওয়া গেছে। এখানে কর্তা অনুপস্থিত, অপরাধী অদৃশ্য, হত্যাকাণ্ড ভাষার ভেতরেই মুছে যায়। [8]

এই দৃশ্য যদি আমাদের কাছে পরিচিত মনে হয়, তবে সেটি কাকতালীয় নয়। এটাই আধুনিক গণমাধ্যমের বড় বাস্তবতা: ভাষা দিয়ে অপরাধকে দৃশ্যমান করা যায়, আবার ভাষা দিয়েই অপরাধীকে আড়াল করা যায়।

প্রোপাগান্ডার বিরুদ্ধে লড়াই: সত্যের পক্ষে নতুন গণমাধ্যম

ম্যালকম এক্স সতর্ক করে বলেছিলেন, যদি তোমরা প্রচারমাধ্যমের লেখা ভাষার আড়ালের অর্থ পড়ার বিশ্লেষণক্ষমতা তৈরি না করো, তবে তারা আবারও দাহশালা বানাবে, আর তোমরা জেগে ওঠার আগেই তোমাদের সেখানে ঢুকিয়ে দেবে। [9]

প্রোপাগান্ডার লক্ষ্য হলো সত্যকে ঢেকে দিয়ে নিজের তৈরি বিকল্প সত্য প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু নতুন গণমাধ্যম আমাদের সামনে ভিন্ন এক সুযোগ এনে দিয়েছে। এখন প্রত্যেক মানুষের হাতেই এমন মাধ্যম আছে, যার মাধ্যমে সত্য ছড়ানো যায়, মিথ্যা ভাঙা যায়, এবং প্রোপাগান্ডার জাদুকরদের বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করা যায়।

সম্ভবত এবার এখানেই পার্থক্য তৈরি হয়েছে। দখলদার শক্তি গণমাধ্যমের যুদ্ধ পুরোপুরি জিততে পারেনি। ফিলিস্তিনি কনটেন্ট বহু ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের কনটেন্টের চেয়ে বহুগুণ বেশি দর্শক পেয়েছে। ফলে তারা আশ্রয় নিয়েছে কনটেন্ট মুছে ফেলা, সীমাবদ্ধ করা এবং প্রচাররোধের পথে। কিন্তু সত্যের নিজস্ব দীপ্তি আছে; তা সব মিথ্যা প্রতারণার ওপরে জ্বলে উঠতে পারে।

এই লড়াইয়ে নবী মুহাম্মদ -এর সেই কথাটিও স্মরণীয়, যা তিনি হাসসান ইবন সাবিতকে বলেছিলেন: মুশরিকদের বিরুদ্ধে কবিতায় জবাব দাও; রূহুল কুদুস তোমার সঙ্গে আছেন। [10]

তখন কবিতা ছিল আরবদের গণমাধ্যমমানুষ মুখে মুখে তা ছড়িয়ে দিত, স্মরণ করত, আবৃত্তি করত। আজ আমাদেরও নিজস্ব গণমাধ্যম আছে। তাই সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো, মিথ্যার বিরুদ্ধে বলা, এবং প্রোপাগান্ডার মুখোশ খুলে দেওয়াএটিও এক ধরনের সীমান্তরক্ষা। এই ময়দানে দাঁড়াতে হলে আমাদের সচেতন হতে হবে, বিশ্লেষণী হতে হবে, এবং বিশ্বাস রাখতে হবে যে সত্যের পক্ষে সংগ্রাম কখনো একা হয় না।