কায়রোর পথে এক অনিশ্চিত সফরের দিনলিপি- ২
পরিকল্পনা অনুযায়ী আজ যাওয়া হবে ‘জামেয়াতুল আজহার’-এ। স্বপ্নের ক্যাম্পাস। মাদরাসার চার দেওয়ালের বাইরের দুনিয়া অতিক্রম করে চোখ যখন কোনো বিশ্ব শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের স্বপ্নে বিভোর হতো, আজহারই ছিল সেই প্রথম স্বপ্ন। আমার প্রতি আল্লাহর অপার মেহেরবানি—শিক্ষাজীবনের যথাসময়ে একটি স্বপ্ন জেগেছিল। আজহারে পড়ার স্বপ্ন। কোনো এক সন্ধ্যায় কথা হচ্ছিল ‘ডক্টর মাহমুদুল হাসান’-কে নিয়ে। উপস্থিতিদের চোখেমুখে শায়খের প্রতি মুগ্ধতা দেখে মনের অজান্তে মানসপটে স্থান করে নেন শায়খ মাহমুদুল হাসান আজহারী। আর সেদিন থেকে ‘আজহার’ মন-মগজে প্রোথিত হয়ে যায়।
সময় যত যায়, আজহারের প্রতি টান বাড়তে থাকে। নিয়ম করে ঠিক করলাম—‘আজহার’-এ পড়ে দুনিয়াব্যাপী ইসলামের দাওয়াতের কাজ করব। কিন্তু মহান রবের মাশিয়াত ছিল ভিন্ন। দারুল উলুমের ভারত হয়ে হারামাইনের দেশে নিয়ে এলেন। আসলে আমরা যা ভাবি, রাব্বুল আলামীন তার চেয়েও উত্তম কিছু আমাদের জন্য রাখেন—আমরা তা জানি না।
আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে যাওয়ার আগে ইমরান আজহারী ভাই আমাকে নিয়ে প্রথমে একটি সিম কিনে দিলেন। এরপর রওয়ানা দিলাম গন্তব্যের উদ্দেশে। বাসা থেকে হেঁটে যাওয়া যেত। নতুন হিসেবে অনেক কিছু চিনব না বলেই গাড়িতে যেতে হলো। জ্যামের কারণে একটু আগেই নেমে যাই। রাস্তায় গাড়ির ভিড়। বাংলাদেশের মতো পথচারীদের হাঁটার জন্য আলাদা কোনো স্থান নেই। ফুটপাত দিয়ে হাঁটছি। কিছুক্ষণ পর চোখে ধরা পড়ল আজহারের পুরোনো ক্যাম্পাস; যেখানে রয়েছে আরবি ভাষা অনুষদসহ কয়েকটি অনুষদ। রাস্তা পার হয়ে ক্যাম্পাসের তোরণ দিয়ে প্রবেশ করব, এমন সময় সিভিল ড্রেসে বসে থাকা কয়েকজন ভদ্রলোক সুন্দর করে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কে?” আমি সোজা উত্তর দিলাম, “আমি দর্শনার্থী।” কিছু বুঝে ওঠার আগেই কী যেন একটা বলে আমাকে প্রবেশ করতে নিষেধ করে দিলেন। এখন যতটুকু সেই আওয়াজ ক্ষীণভাবে কানে বাজে, তা ছিল এমন—“আমি জিজ্ঞেস না করলে তো এমনিতেই ঢুকে যেতেন।” যেন আমি গোপনে সেখানে প্রবেশের চেষ্টা করছিলাম। আমার জানা ছিল না, আজহারের পথ সবার জন্য উন্মুক্ত নয়। “(حاجة حلوة) হা-গা হুলওয়া” (বকশিশ) দিলে সেদিন আজহারে প্রবেশ করতে পারতাম কি না- জানি না। যার জন্য দুনিয়ার সকল দরজা বন্ধ, আল্লাহর দরবারের দরজা তার জন্য খোলা।
পাশেই ছিল ‘জামিউল আজহার’। ‘জামেয়াতুল আজহার’ আর ‘জামিউল আজহার’-এর পার্থক্য আশা করি ধরতে পেরেছেন। আসলে ঐতিহ্যবাহী যে স্থানে প্রাচীনকাল থেকে দারস হয়ে আসছিল, সেটিই এই জামিউল আজহার বা আজহার জামে মসজিদ। মসজিদের প্রবেশদ্বারেই দেখলাম ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে কিছু স্থাপনা। একটি নামফলকে দেখতে পেলাম- "আল মাদরাসুল আকবগাবিয়া" আর "আল মাদরাসাতুত -তাইবারসিয়া"। প্রথমটি ৭৪০ হি. সনে নির্মাণ করেছিলেন আমির আলাউদ্দিন আকবুগা আব্দুল ওয়াহিদ, যিনি সুলতান আল-নাসির মুহাম্মদ ইবনে কালাউনের আমলে মামলুক বাহিনীর আগুয়া (মোকাদ্দিম) ছিলেন। মাদরাসার এই স্থানটি ছিল আমির কেবির ইজ্জুদ্দিন আইদামার আল-হিল্লির বাড়ি। মাদ্রাসা নির্মাণ শেষে আমির আকবুগা এতে শাফেঈ ও হানাফি মাজহাবের জন্য পাঠদানের ব্যবস্থা করেন এবং প্রয়োজনীয় কর্মচারী নিয়োগ দেন। এই মাদ্রাসাটি ৮৪৫ হিজরি (১৪৪২ খ্রিস্টাব্দ) পর্যন্ত পূর্ণরূপে চালু ছিল। বর্তমানে আল-আজহার মসজিদের গ্রন্থাগারের একটি অংশ এটি দখল করেছে। (আদ-দুরার)
দ্বিতীয়টি মাদরাসাটি ৭০৯ হি. সনে নির্মাণ করেছিলেন আলাউদ্দিন তাইবারস আল-খাজান্দার — মিশর দেশের সেনাবাহিনীর নকীব (প্রধান) সুলতান আল-নাসির মুহাম্মদ ইবনে কালাউনের আমলে এর নির্মাণকাজ শেষ হয়। এটি আল-আজহারের সংযুক্ত মাদ্রাসাগুলোর অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং প্রতিষ্ঠাতা আলাউদ্দিনের নামানুসারে 'আল-মাদরাসা আত-তাইবারসিয়া' নামে পরিচিতি পায়। তিনি এখানে শাফেঈ ফকিহদের জন্য পাঠদানের ব্যবস্থা করেন। এর পাশে তিনি একটি অজুখানা ও একটি পশুপাখির জন্য হাউজ-সহ জলপথ তৈরি করেন। (আদ-দুরার)
সুবিশাল মসজিদ প্রাঙ্গণ। চারপাশে বিভিন্ন হালাকা (গ্রুপ) বসে পড়ছে, মুযাকারা করছে। মসজিদে প্রবেশ করে দেখি, এখানেও দারসের জন্য কয়েকটি আসন রাখা আছে। শুনলাম, আজহারের নির্ধারিত আলেমগণ এখানে রুটিনমাফিক দারস প্রদান করেন। আমি যোহরের আগে-পরে প্রবেশ করেছিলাম। তখন কোনো দারস চলছিল না। তবে খেয়াল করলাম, মসজিদের প্রথমভাগে কোনো একজন আলেমের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন এক ভদ্রমহিলা। সম্ভবত কোনো টিভি প্রোগ্রামের জন্য। রমজান আসন্ন। হয়তো রমজান উপলক্ষেই ছিল সেই আয়োজন। যিকির-ফিকিরে কাটালাম অনেকক্ষণ। মিসবাহ আসার কথা। আসরের আগে বা পরে সে এলো। সেদিন বিমানবন্দরে নাঈমের সঙ্গে মিসবাহও ছিল। সে প্রিয় ‘মোজাহেরুল উলুম’র ছাত্র। সম্ভবত সেখান থেকে দাওরা শেষ করে এখন আজহারে পড়ছে। আমরা জামিউল আজহার থেকে বেরিয়ে রাস্তা পাশের গলিতে প্রবেশ করলাম। দুপুরের খাবার খাওয়া হয়নি। মিসবাহকে নিয়ে একটি মিসরীয় হোটেলে বসলাম। চা খাওয়ার ইচ্ছে করছিল। মসজিদের পাশে যে দোকানগুলো আছে, সেখানে দুধ-চা পেলাম না। দোকানওয়ালা কোথা থেকে তরল দুধ এনে চা বানিয়ে খাওয়াল। মনমতো না হলেও আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলাম। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে মিসবাহর সঙ্গে গল্প করছিলাম—মিশরে পড়াশোনা, জীবনযাপনের খরচ ইত্যাদি নিয়ে। তার কথার খোলাসা—দেশ থেকে এখানে অনেক ভালো। থাকা-খাওয়ার খরচও হাতের নাগালে। বুঝতে পারলাম, কেউ এখানে একবার এসে গেড়ে বসতে পারলে সে দেশে আর ফিরতে চাইবে না। চায়ের দোকান থেকে কিতাবের দোকানের দিকে মুখ করলাম। আজহার মসজিদের পাশেই অনেকগুলো দোকান। আমাদের আন্দরকিল্লার মতো পুরোনো সব দোকানপাট। কয়েকটি দোকান ঘুরে কিছু কিতাব কেনা হলো। ইমাম গাযালি (রাহি.)-এর আল-মুনকিয, মাকাসিদুল ফালাসিফা, তাহাফুত—আরও কিছু কিতাব। শাতেবীর আল-মুওয়াফাকাত-এর একটি দারুণ সংস্করণ দেখলাম। শায়খ আব্দুল্লাহ দাররাজের নাম দেখতেই কিনে ফেললাম। মাগরিব হয়ে যায়। এর আগে আর কোথাও গিয়েছিলাম কি না, এখন আর মনে করতে পারছি না। তবে কথা ছিল আল্লামা আসকালানি ও আইনি (রাহি.)-এর কবর জিয়ারত করে আসার। সেদিন আর হলো না। মাগরিবের নামাজ আদায় করলাম হুসাইন মসজিদে। বলা হয়, এখানে হযরত হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর শির মুবারক দাফন করা আছে। আল্লাহু আ‘লাম। মসজিদের পাশেপাশে যেন মেলা বসেছে। মানুষের ভিড়ও কম নয়। শবে বরাত উপলক্ষে এখানে চলছিল মাহফিল। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বের হয়ে গেলাম। হুসাইন মসজিদ থেকে মূল রাস্তায় এলে সামনে দেখা যায় আজহার জামে মসজিদের প্রাচীন মিনার। রাতের কৃত্রিম আলোকসজ্জার কারণে তার সৌন্দর্য আরও বেড়ে গেল। আবারও প্রবেশ করলাম 'জামে আজহার'এ। ঈশার জন্য অপেকশাহ করছিলাম। মিসবাহর পরিচিত কেউ এলে আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। কেউ কেউ কথা বলার জন্য বসছেও। কয়েকজন চট্টগ্রামের ছাত্র এলো। তাদের সঙ্গে খোলামেলা কিছু কথাও হলো। তাদের কেউ একজন জানাল—এখানে পড়তে আসা বাংলাদেশিরা বিভিন্ন মতাদর্শ ও দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। নিজেদের মতো করে সুন্দরভাবে সংঘবদ্ধ হয়ে থাকে। আরও জানলাম, কওমি মাদরাসার অনেক ছাত্র রয়েছে এখানে। ভাবতে লাগলাম— একদিকে দেওবন্দের পথ বন্ধ, অন্যদিকে আজহারের পথ খোলা। সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত নেমে এসেছে। রাত তার কালো চাদর দিয়ে কায়রোর পুরো শহরকে ঢেকে দিয়েছে। আমারও ফিরতে হবে। মেজবানের বাসায় খাবারের কী অবস্থা, জানি না। তাই একটু-আধটু খেয়ে নিলাম। এরপর বাসায় পৌঁছে দেখলাম—ইমরান ভাই আজ নিজেই রান্না করেছেন আমার জন্য। প্রবাসে একলা যারা পড়াশোনার জন্য আসেন, তাদের অনেকেই যেনতেনভাবে খেয়ে-দেয়ে দিনাতিপাত করেন। আল্লাহ সকল প্রবাসীর কল্যাণ করুন। খাওয়া-দাওয়া সেরে ঘুমের জন্য বিছানায় শুয়ে কল্পনা করছি পরের দিনের কর্মসূচি। বুঝতেই পারলাম না, ক্লান্ত শরীর নিয়ে কবে যে ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমালাম। এভাবেই মিশর সফরের আরও একটি দিনের সমাপ্তি হলো। কায়রোর পথে এক অনিশ্চিত সফরের দিনলিপি- ২ ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪



